ডঃ খলীকুজ্জমান এর কলাম “করোনাভাইরাসঃ ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দাঁড়ান”

ডঃ কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ কলাম “করোনাভাইরাসঃ ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দাঁড়ান”

প্রকাশ: ২৪ মার্চ ২০২০, দৈনিক সমকাল।

করোনাভাইরাস সংক্রমণজনিত এই দুঃসহ সময়ে, সবারই ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে নিজে নিরাপদ থাকতে এবং অন্যদের নিরাপদ রাখতে করণীয় ও বর্জনীয় সবকিছু ঠিকমতো পালন করা জরুরি কর্তব্য। যথা- ঘন ঘন প্রতিবার অন্তত ২০ সেকেন্ড সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, সামাজিক যোগাযোগ এড়িয়ে চলা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা ইত্যাদি।

টেস্টিং ও চিকিৎসা সুযোগ-সুবিধাদি দ্রুত বাড়ানো জরুরি। বর্তমানে তা খুবই সীমিত এবং একেবারে অপ্রতুল, যদি সংক্রমণ বিস্তৃত হয়ে পড়ে। তবে বিস্তৃতি প্রতিহত করার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। সেই লক্ষ্যে যা যা করা দরকার, সব ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে যারা নিয়মনীতি মানবেন না, তাদের বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ইতোমধ্যে সরকার ৩-৪টি দেশ ছাড়া সব দেশের সঙ্গে বিমান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে এবং যারা কোয়ারেন্টাইন মানছেন না তাদের ওপর অর্থদণ্ড আরোপ করা হচ্ছে। করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়াদি সম্বন্ধে টিভি ও অন্যান্য ব্যবস্থার মাধ্যমে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। প্রয়োজনে এই লক্ষ্যে আরও কার্যক্রম গ্রহণ করতে সচেষ্ট থাকতে হবে।

এ ক্ষেত্রে একটি বিশেষ বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া জরুরি আর তা হচ্ছে, করোনাভাইরাস টেস্টিং এবং আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত সব ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার জন্য পিপিই (মাস্ক, গাউন, গ্লাভস ইত্যাদি) সরবরাহ নিশ্চিত করা। বেসরকারি খাত ও এনজিওগুলো ইতোমধ্যে এ সম্বন্ধে কিছু পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। সক্ষমতা অনুযায়ী আরও ব্যাপক কর্মসূচি তাদেরকে নিতে

হবে এবং তারা তা করবে বলে আমার বিশ্বাস।

এই দুঃসময়ে মানুষের দুর্ভাগ্যকে পুঁজি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে এবং বাজারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করা থেকে বিরত থাকা মানবিকতার তাগিদ। তবে যারা এ ধরনের অমানবিক কাজে লিপ্ত হবে, তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। আমরা যদি একদিনে কয়েক সপ্তাহের বাজার কিংবা প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি বাজার করি, তাহলে অনেকে হয়তো তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যও পাবে না। বস্তুত ক্রেতারা যখন চাহিদার তুলনায় বেশি বাজার করতে থাকে, তখনই বিক্রেতারা দাম অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ পায়।

এই সম্ভাব্য বিধ্বংসী পরিস্থিতিতে আমরা কি মানবিকতা ও মানবিক-সামাজিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হতে পারি না বর্তমানে ও সবসময়ের জন্য? এই পৃথিবীতে স্বল্প সময়ের বসবাসে লোভ ও ক্ষমতালিপ্সায় বিভোর হওয়া কেন? মনে রাখতে হবে, মৃত্যু সবাইকে এক সমতলে দাঁড় করিয়ে দেয়। আর মৃত্যুর পর আমাদের ভালো কাজগুলোই টিকে থাকে। আমাদের অনুপস্থিতিতেও আমরা কীভাবে স্মরিত হবো, তা নির্ভর করে আমাদের জীবিতকালীন কাজের ওপর। এই দুর্যোগের

সময় সবাই যেন সর্বোচ্চ সদিচ্ছা প্রদর্শন করি।

আমাদের মধ্যে যারা অধিক ভাগ্যবান তাদের এটা দায়িত্ব যে, তারা যেন পিছিয়ে থাকা এবং অন্যান্য বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে এই দুঃসময়ে দাঁড়ান, যাতে এসব দুর্ভাগ্যের শিকার মানুষ বাঁচতে ও ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। আমাদের বাড়িতে বা অফিসে নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ কাজ করেন। এই দুর্যোগের সময় বাড়তি খরচ তাদের স্বাভাবিক জীবনমানকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। আমরা

যার যা সাধ্যমতো তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি।

অবশ্য এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব অগ্রগণ্য। এই লেখা যখন লিখছি তখন টানা ১০ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ‘সামাজিক দূরত্ব’ রক্ষা সহজ হবে নিশ্চয়ই। সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সরকারের একটি বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত, যাতে আর্থ-সামাজিক গ্রুপভিত্তিক সহায়তা-ব্যবস্থা থাকবে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গোষ্ঠীগুলো যাতে সমস্যা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সে জন্য সময়োপযোগী যথাযথ ব্যবস্থা থাকবে। এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আছে কৃষি শ্রমিক, দিনমজুর, প্রান্তিক কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত মানুষ।

আতঙ্কিত না হয়ে আমরা সবাই মিলে সতর্ক থেকে যার যার দায়িত্ব অনুযায়ী এবং যার যার অবস্থান থেকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে এই সম্ভাব্য করোনা-সংকট কাটিয়ে উঠতে সচেষ্ট হই। মুক্তিযুদ্ধজয়ী জাতি নিশ্চয়ই করোনা আগ্রাসনকে পরাজিত করে এগিয়ে যাবে।

হ অর্থনীতিবিদ

Source:

About the author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *