প্যারিস জলবায়ু চুক্তি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রঃ দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রবন্ধ

ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ। ১৩ জুন, ২০১৭ ইং
সারাবিশ্বেই দেখা যাচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে এবং অধিকতর বিধ্বংসী হচ্ছে। উন্নয়নশীল বিশ্বে যেমন, তেমনি উন্নত বিশ্বে। বিগত কয়েক বছর ধরে বন্যা, খরা এবং ঘূর্ণিঝড় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে ক্ষয়-ক্ষতি ঘটিয়েছে। ব্যাপক বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে যুক্তরাজ্য ও জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। ইথিওপিয়ায় বছর দুয়েক আগে দীর্ঘ খরায় সে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা কঠিন সংকটে পড়ে। ফিলিপাইন ঘন ঘন হ্যারিকেন দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। বাংলাদেশও প্রতিবছরই সাধারণভাবে যেমন ঘটে তার চেয়ে অধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে। ২০০৯-এর পর ২০১৬ এবং ২০১৭-তে বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় যথাক্রমে রোয়ানু এবং মোরা আঘাত হানে।  ২০১৭-তে ঘূর্ণিঝড় মোরা ছাড়াও দেশের সকল হাওর এলাকা বিধ্বংসী ফ্লাস-বন্যার কবলে পড়েছে। এখনো পুরোপুরি এই দুই সর্বশেষ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ক্ষয়-ক্ষতির সঠিক হিসাব জানা যায়নি, তবে অসংখ্য মানুষ অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অসংখ্য ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অথবা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। অবকাঠামোগত অনেক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে এবছরে (২০১৬-১৭) ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে। উক্ত দু’টি ঘূর্ণিঝড় থেকে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিলে হয়তো-বা এবছর প্রবৃদ্ধি কিছু কমে যেতে পারে। আবার এই ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত অসংখ্য মানুষকে পুনর্বাসিত করার জন্য যে সম্পদ ব্যয় করতে হবে তার কারণে আগামী বছর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তা ছাড়া এবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ যে আর হবে না তা বলা যাচ্ছে না। মৌসুম এখনো কয়েক মাস বাকি রয়েছে। সাধারণত বিগত বছরগুলোতে গড়ে বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যে ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং পুনর্বাসনে যে ব্যয় করতে হয় তার ফলে জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধিতে অর্জন কম হচ্ছে। অন্যথায় আরো এক থেকে দেড় শতাংশ প্রবৃদ্ধি বেশি হতে পারতো। অর্থাত্ সাত-এর জায়গায় সাড়ে আট হতে পারতো।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর সম্মুখসারিতে বাংলাদেশ। যদি জলবায়ু পরিবর্তনের ধারা খারাপ থেকে খারাপতর হতে থাকে তাহলে পুনরুদ্ধার কঠিন থেকে কঠিনতর হবে এবং অবশেষে তা সম্ভব না হওয়ার পর্যায়ে চলে যাবে বাংলাদেশ এবং অন্যান্য অধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য। দীর্ঘদিন আলোচনার পর ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে প্যারিসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বের সকল দেশের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণে আনা এবং এর কারণে ঘন ঘন এবং অধিক বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগ যে ক্ষয়ক্ষতি সাধন করছে সে বিষয়ে অভিযোজন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। উন্নয়নে বিভিন্ন পর্যায়ের দেশগুলোর জন্য তাদের দায়দায়িত্ব ও সক্ষমতার ভিত্তিতে এক ধরনের কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার কার্যক্রম চিহ্নিত করা হয়।
এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ পৃথিবীর উষ্ণতা শিল্পবিপ্লবের পূর্বের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অনেক কম এবং সম্ভব হলে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমিত রাখার লক্ষ্য এই চুক্তিতে নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে যে অঙ্গীকার উন্নত বিশ্বসহ পৃথিবীর অন্য সকল দেশ করেছে তা বিবেচনায় নিয়ে দেখা যায় প্রত্যেক দেশ তাদের প্রস্তাবিত হারে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনলেও পৃথিবীর গড় উষ্ণতা সাড়ে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ। ইতোমধ্যে পৃথিবীর উষ্ণতা এক ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি বেড়ে গেছে। তার ফলেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের তাণ্ডব বিভিন্ন দেশে ঘটছে এবং কোটি মানুষ দুর্ভোগে নিপতিত হচ্ছে। আর পৃথিবী তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে বেশি উষ্ণ হলে অনেক দ্বীপরাষ্ট্র নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে, অনেক দেশের উপকূল এলাকায় অনেক ক্ষয়ক্ষতি হবে, অনেক কৃষি জমি ব্যবহারযোগ্য থাকবে না, অনেক অদরিদ্র মানুষ দরিদ্র হবে, অনেক দরিদ্র মানুষ নিঃস্ব হবে, অনেক মানুষ উদ্বাস্তু হবে এবং আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো ধসে পড়বে।
বাংলাদেশের উপকূল অনেক দীর্ঘ (সাতশ’ ১০ কিলোমিটার) এবং ছোট ছোট অনেক দ্বীপ রয়েছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং ডুবে যাবার কারণে এলাকাগুলো বাস উপযোগী থাকবে না এবং এই এলাকাগুলোতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুদ্ধার সম্ভব নয় এমনভাবে বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। ফলে লাখো মানুষ উদ্বাস্তু হবে। এই প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। যদিও প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে অনেক দুর্বলতা এবং অনেক ঘাটতি রয়েছে তারপরও এর ফলে পৃথিবীর সকল দেশের সমন্বয়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এগিয়ে যাওয়ার একটি পথ সৃষ্টি হয়েছে। পাঁচ বছর পর পর পুনর্মূল্যায়ন করে গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ আরো বেশি হারে এবং আরো দ্রুত কমিয়ে আনার একটি সুযোগ রয়েছে এতে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ঘটানোয় এবং অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে যে দেশটির অবদান অত্যন্ত উঁচুমাত্রায় সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনান্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে এই চুক্তি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে চুক্তিটি অনেকখানি দুর্বল হয়ে পড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনা, স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর আওতায় নির্ধারিত দায়িত্বের কোনোটাই বাস্তবায়িত করবে না। ইতোমধ্যে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক পর্যায়ে যে তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেওয়ার কথা ছিল তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এটি একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন পদক্ষেপ। অবশ্য এটি তার নির্বাচনী অঙ্গীকারের মধ্যে ছিল। তবে অনেকে আশা করেছিলেন নির্বাচনী অঙ্গীকার হলেও ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই সিদ্ধান্ত নেবেন না। তবে দেখা যাচ্ছে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই ডোনাল্ড ট্রাম্প চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য পৃথিবীর ষষ্ঠতম অর্থনৈতিক শক্তি এবং এ অঙ্গরাজ্য ইতোমধ্যেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে অনেক এগিয়ে গিয়েছে এবং এই অঙ্গরাজ্যের প্রশাসন ঘোষণা দিয়েছে যে এ কার্যক্রম আরো জোরদার করা হবে। একইভাবে অন্যান্য কয়েকটি মার্কিন অঙ্গরাজ্যও গ্রিন হাউস গ্যাস কমানো অব্যাহত রাখবে এবং শক্তিশালী করবে বলে জানিয়েছে। এ ছাড়া মার্কিনি অনেক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন। বিরোধিতা আসছে উন্নত এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রায় সর্বত্র থেকে। বাংলাদেশও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এই হঠকারী সিদ্ধান্তে একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন ও বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের বিরোধী অবস্থান নিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হয়েছে। আর বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ক্ষতিগ্রস্ত হবে যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতিকর। তবে উন্নত বিশ্ব এবং উন্নয়নশীল দেশসমূহ এই চুক্তি বাস্তবায়নের কাজ চালিয়ে যাবে। আমি আশা করবো চুক্তির আওতায় থাকা সব দেশ, বিশেষ করে উন্নত দেশসমূহ এবং অধিক গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণকারী উন্নয়নশীল দেশসমূহ তাদের গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ আরো দ্রুত এবং গভীরভাবে কমিয়ে আনবে যাতে জলবায়ু পরিবর্তন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। সময়ে দেখা যাবে এই আশাবাদ কতটা বাস্তবে রূপ লাভ করবে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যাই ঘটুক না কেন বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে পরিকল্পিতভাবে নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা গ্রহণ করে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় প্রচেষ্টা চালাতে হবে। অবশ্যই পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন সৃষ্টিকারী উন্নত বিশ্বের উপর চাপ অব্যাহত রাখতে হবে যাতে তারা গ্রিন হাউজ গ্যাস আরো দ্রুত কমায় এবং উন্নয়নশীল বিশ্ব নিজেরা দায়ী না হয়েও যে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে তা মোকাবিলা করার জন্য অর্থায়ন করবে, প্রযুুক্তি হস্তান্তর করবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও জনবল পর্যায়ে দক্ষতা বাড়ানোর জন্য সহায়তা দেবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ
সোর্সঃ ১৩ জুন, ২০১৭ ইং, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, উপসম্পাদকীয়, দৈনিক ইত্তেফাক।
Source Link: http://www.ittefaq.com.bd/print-edition/sub-editorial/2017/06/13/202160.html

About the author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *