বিশেষজ্ঞ মত “অনিয়মে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে”

ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ এর কলাম।
প্রকাশ: ২ এপ্রিল, ২০২০, দৈনিক কালের কণ্ঠ।

দরিদ্র মানুষের জন্য ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম-দুর্নীতি হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার যে হুঁশিয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিয়েছেন আমি তাকে স্বাগত জানাই। মনে হচ্ছে, অনিয়মের বিরুদ্ধে এবার প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত শক্ত অবস্থানে। তবে অনিয়ম ও দুর্নীতি দূর করতে চাইলে যারা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দরিদ্রদের ত্রাণ দেওয়ার ক্ষেত্রে এর আগেও দেশে অনিয়ম হয়েছিল। কিন্তু তারা রাজনৈতিক বিবেচনায় হোক আর প্রশাসনিক বিবেচনায় হোক, ছাড় পেয়ে গেছে। তাদের কোনো বিচার হয়নি। একবার ছাড় পেয়ে গেলেই মনে করা হয়, অনিয়ম করেও কিছু হয় না। ছাড় পাওয়া যায়। এই মানসিকতার কারণেই দেশে ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম হচ্ছে। দেশে বছরের পর বছর ধরে এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি চলছে। আমি আশা করছি, এবার প্রধানমন্ত্রী অনিয়মের বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছেন, তাতে যারাই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত প্রমাণিত হবে, তাদের শাস্তি নিশ্চিত হবে। একবার যদি শাস্তি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে অন্যদের কাছে একটা মেসেজ যাবে। অন্যরা আর অনিয়ম করার সাহস পাবে না। প্রশাসনিক কর্মকর্তা হোক আর রাজনৈতিক নেতা হোক, যিনি অনিয়ম করবেন, তাঁর বিরুদ্ধেই শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই শুধু অনিয়ম দূর করা সম্ভব হবে।

আমাদের মূল্যবোধের মারাত্মক অবক্ষয় হয়েছে। এই মূল্যবোধ একদিনে অবক্ষয় হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে। আমি মনে করেছিলাম করোনাভাইরাসের কারণে মূল্যবোধ কিছুটা হলেও জাগ্রত হবে। কারণ করোনাভাইরাস তো ধনী-গরিব সবাইকে ধরছে। সবার মধ্যেই মৃত্যুর ভয় হওয়ার কথা। কিন্তু গরিব মানুষের দুর্দশাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির মানুষ এই ক্রান্তিলগ্নেও নিজেদের পকেট ভরছে। এটা অবিশ্বাস্য। অনিয়মটা রাজনৈতিক বলি বা প্রশাসনিক বলি, সব পর্যায়েই হচ্ছে। এই সময়ে যদি মূল্যবোধ না জাগে আর কবে জাগবে? কারণ অন্য সময়ের বিপর্যয়ের সঙ্গে এবারের মানবিক বিপর্যয় পুরোপুরি ভিন্ন।

করোনাভাইরাসের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে স্বল্প আয়ের মানুষ। সরকারের উচিত, ঢাকাসহ সারা দেশে অনানুষ্ঠানিক খাতে যে ৮৫ শতাংশ মানুষ সম্পৃক্ত আছে, তাদের চিহ্নিত করে সঠিক জায়গায় ত্রাণের ব্যবস্থা করা। কাজটি কঠিন; কিন্তু করতে হবে। সে জন্য শুধু প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতাও নিতে পারে সরকার। সেটি করতে পারলে অনানুষ্ঠানিক খাতে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদেরকে ত্রাণ দেওয়া সহজ হবে। সামনে বোরো ধান উঠার সময়। সেই সময় কৃষক যাতে ধান কাটতে গিয়ে শ্রমিক সংকটে না পড়েন, সেদিকে এখন থেকে নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনেই যাতে মাঠে ধান কাটা হয়, সেই বিষয়টিও দেখতে হবে।

আমাদের মধ্যে অনেকে আছেন, যাঁরা ত্রাণ দেওয়ার সময় টেলিভিশন নিয়ে যান। মোবাইল ফোনে ছবি তোলেন। এভাবে ঢাকঢোল পিটিয়ে সবাইকে জানিয়ে ত্রাণ দেওয়ার মধ্যে কোনো স্বার্থকতা নেই। আবার যাঁরা ত্রাণ নিতে আসেন, তাঁরাও হৈ-হুল্লোড় করেন। বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করেন। এই ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অবশ্য এ জন্য যাঁরা ত্রাণ দেন, তাঁদেরকে আগেই পুরো এলাকা শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। সবাইকে মাস্ক পরতে হবে। হাতে গ্লাভস পরতে হবে। যখন নিশ্চিত হবেন সবাই শৃঙ্খল অবস্থায় আছেন, তখন ত্রাণ দিতে যাবেন। সবারই দায়িত্ব আছে। যিনি ত্রাণ দেবেন তাঁরও দায়িত্ব আছে। আবার যিনি ত্রাণ নিতে এসেছেন তাঁকেও লাইনে দাঁড়িয়ে শৃঙ্খল অবস্থায় ত্রাণ নিতে হবে। মুখে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে ত্রাণ বিতরণের সঙ্গে সবাইকে। গ্লাভস পরতে হবে। তার পরই ত্রাণ বিতরণ করতে হবে।

লেখক : চেয়ারম্যান, পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)

https://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2020/04/02/893683

About the author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *