সমকাল সম্পাদকীয়ঃ মুক্তিযুদ্ধ থেকে করোনাযুদ্ধ

মুক্তিযুদ্ধ শুরু ২৬ মার্চ ১৯৭১, ওই দিন অতি ভোরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই। আট মাস কুড়ি দিন যুদ্ধ শেষে দেশের মুক্তি অর্জিত হয়। ঊনপঞ্চাশ বছর পর সেই মার্চ মাস এলো আবার এক যুদ্ধের দামামা নিয়ে। যদিও বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ে ৮ মার্চ, এর বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ শুরু সেই ২৬ মার্চ। ওই ছুটির দিন অন্তর্ভুক্ত করে সরকারি-বেসরকারি সব অফিস ছুটির মাধ্যমে। ছুটি ঘোষণার কয়েক দিন পর দেশকে ব্যাপক ‘লকডাউন’ করা হয়। মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে অর্থনীতি খুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে সব অফিস ৩০ মে পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। করোনা-যুদ্ধাবস্থা কতদিন থাকবে, বলা যাচ্ছে না।

মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা করোনাযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক। প্রধানমন্ত্রী তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিচ্ছেন, প্রতিদিনই নিরলস পরিশ্রম করছেন, যাতে এই যুদ্ধে সম্ভাব্য সর্বনিম্ন জীবন-জীবিকা এবং আর্থ-সামাজিক ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চিত করে জয়লাভ করা যায়। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশকে হানাদার মুক্ত করা ছিল পরম গৌরবের কাজ। করোনাযুদ্ধকে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সেই অর্থে তুলনা করা যায় না। তবে এক অভূতপূর্ব মহামারি থেকে জনগণের জীবন-জীবিকা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করাও এক মহান যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালির যুদ্ধ। করোনাযুদ্ধ গোটা মানব জাতির যুদ্ধ, খালি চোখে অদৃশ্য অথচ সাংঘাতিক শক্তিশালী এক শত্রুর বিরুদ্ধে। প্রচলিত যুদ্ধাস্ত্র এক্ষেত্রে কাজে আসছে না, পরমাণু অস্ত্রও এখানে অসহায়।

এই যুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র দুটি; একদিকে জনসমাগম থেকে দূরে থেকে স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং অন্যদিকে আক্রান্তদের শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা। অর্থাৎ এই যুদ্ধে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সবার এক নতুন ধরনের জীবনযাপনে মনোযোগী হওয়া। ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী হচ্ছেন এ যুদ্ধে সম্মুখ সারির যোদ্ধা। করোনাকালে লকডাউনসহ শৃঙ্খলা বজায় রাখা, ত্রাণ বিতরণ করা এবং সঠিক তথ্য তুলে ধরার বিবেচনায় প্রশাসন, পুলিশ ও সাংবাদিকরাও এই যুদ্ধে সম্মুখ সারির যোদ্ধা। এই যোদ্ধারা নিজেরা সবচেয়ে ঝুঁকির মুখে; কাজেই তাদের পিপিই বা ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রীর প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।

এখন পর্যন্ত কভিড-১৯ এর কোনো প্রতিষেধক নেই। গবেষণা চলছে, আশা করা যাচ্ছে ২০২১ সালের প্রথম দিকে প্রতিষেধক আবিস্কৃত হয়ে যাবে। তবে প্রতিষেধক আবিস্কার হলেও সব উন্নয়নশীল ও স্বল্প আয়ের দেশ কবে নাগাদ কী পরিমাণে পেতে পারে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ ছাড়া করোনাভাইরাসের ধরন ও চরিত্র বদলায় বলে কোন দেশে কোন প্রতিষেধক কতটা কাজে আসবে, সেটাও বিবেচ্য বিষয়।

এই যুদ্ধে আরও দুটি ফ্রন্ট রয়েছে- এক. মহামারির কারণে জীবিকা বিধ্বস্ত অসংখ্য মানুষের কাছে নগদ অর্থ বা দ্রব্যাদি হিসেবে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছানো। দুই. মহামারির কারণে স্থবির অর্থনীতি পূণ সচল, পুনর্গঠন ও উজ্জীবনের মাধ্যমে সব নাগরিকের পুনর্বাসন ও পুনর্জাগরণ নিশ্চিত করা। আর মূল ফ্রন্ট তো আছেই; করোনা-সংক্রমণ যাতে না বাড়ে, আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসা হয়, সেদিকে কঠোর নজর রাখা।

অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও তিনটি ফ্রন্টে যুদ্ধ চলছে। সংক্রমণ যেহেতু বাড়ছে সক্ষমতা বাড়ানোয় আরও জোর দিতে হবে। সংক্রমণ পরীক্ষা ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে, যাতে সংক্রমণের প্রকৃত অবস্থা জানা যায় এবং সেমতে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। গৃহীত সব কর্মসূচির সময়মতো, স্বচ্ছ ও কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি; কোনো ধান্দাবাজি যেন না ঘটে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। খবর পাওয়া যাচ্ছে, এখানে-ওখানে দুর্নীতি ঘটছে, এমনকি ত্রাণ বিতরণেও। এই দুর্নীতিবাজদের দ্রুত কঠোর হাতে দমন করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু তার সাত মার্চের ভাষণে বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে আহ্বান জানিয়েছিলেন। মুক্তিপাগল বাঙালি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে দলে দলে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। অন্যদিকে করোনাযুদ্ধে ঘরে থাকাটাই যুদ্ধ। শেখ হাসিনা আহ্বান জানিয়েছেন, সবাই যেন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতের পর ২৭ মার্চ বিকেলে কয়েক ঘণ্টার জন্য সান্ধ্য আইন রহিত করা হয়। ওই সময়ে আমি সপরিবারে এলিফ্যান্ট রোডের বাসা ছেড়ে ধানমন্ডিতে এক আত্মীয়ের বাসায় চলে যাই। ৭ থেকে ২৫ মার্চ অসহযোগ আন্দোলনে আমি ও কয়েকজন সহকর্মী অর্থনৈতিক বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে অধ্যাপক নুরুল ইসলামকে দিতাম। তিনি বঙ্গবন্ধুর কাছে পৌঁছে দিতেন। আমার ধারণা, পাকিস্তানিরা এ তথ্য জানত। পরে জেনেছি, ২৮ মার্চ সামরিক বাহিনীর লোকজন আমাকে খুঁজতে বাসায় এসেছিল।

একাত্তরের এপ্রিলের শেষ দিকে অবস্থা স্বাভাবিক দেখানোর অপচেষ্টা চালায় দখলদার বাহিনী। সেই সুযোগে আমি মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে লঞ্চে ঘুরে ঘুরে সিলেট যাই। জকিগঞ্জ থেকে কুশিয়ারা নদী পার হয়ে ভারতের করিমগঞ্জ যাই। ওখানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন তৎকালীন মেজর আব্দুর রব। তার সঙ্গে যোগাযোগ করি; সেখানে কয়েক সপ্তাহ থেকে কলকাতা গিয়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের কাছে রিপোর্ট করি। পরে অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে এবং অধ্যাপক মুশাররফ হোসেন, অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ও ড. স্বদেশ বোসকে সদস্য করে পরিকল্পনা সেল গঠিত হয়। আমাকে সেখানে একজন উপ-প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আমি অন্যান্য কাজের সঙ্গে একটি পাটনীতি তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্ত হই। সেটিই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পাটনীতি হিসেবে গৃহীত হয়। ৩১ ডিসম্বর ১৯৭১ দেশে ফিরে আসি। প্রথম দুই মাস ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন এলাকায় তদারকির দায়িত্ব পালন করি। তারপর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকসে (পরবর্তীকালে বিআইডিএস) ফিরে যাই। এসব বিষয়ে অন্যত্র বিস্তারিত বলেছি।

করোনাযুদ্ধে মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে সার্বক্ষণিক বাসায়। আরও কত দিন এভাবে থাকতে হবে, এখনও বলা যাবে না। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছি এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিধিনিষেধ মেনে চলছি। তবে করোনাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করছি। ২৪ মার্চ থেকে করোনা ও এর অভিঘাত ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করেছি। হিসেব করে দেখলাম- বর্তমানটিসহ ১৪টি নিবন্ধ লিখেছি বিভিন্ন পত্রিকায়, ৬টি ইংরেজি আর ৮টি বাংলা। দুটি সাক্ষাৎকারও প্রকাশ হয়েছে। বিভিন্ন টেলিভশন চ্যানেলে প্রযুক্তির মাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছি অথবা আলোচনা করেছি।

চেয়ারম্যান হিসেবে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) কাজকর্ম নিয়ে সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে একটি জুম-ভিডিও সম্মেলন করি। পিকেএসএফ-সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে টেলিফোন আলাপের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে মতামত দিয়েছি। খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক আয়োজিত করোনাকালে ও পরবর্তী সময়ে খাদ্য ও পুষ্টি ঘাটতি পূরণে করণীয় বিষয়ে জুম-ভিডিও সম্মেলনে চেয়ারম্যান হিসেবে অংশগ্রহণ করি। তামাকবিরোধী মঞ্চ বাংলাদেশের আহ্বায়ক হিসেবে জাতীয় বাজেটে তামাকজাত পণ্যেও কর বাড়ানোর প্রস্তাব তুলে ধরতে অন্যদের সঙ্গে যুক্ত হই।

এভাবেই চলতে হবে, থেমে যাওয়া যাবে না। করোনাযুদ্ধ হঠাৎ করেই বিশ্ববাসীর সামনে হাজির হয়ে গোটা মানব জাতিকেই ঝুঁকির মুখামুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মুষ্টিমেয় কয়েকটি দেশ, যেমন নিউজিল্যান্ড ও ভিয়েতনাম খুব দ্রুত ও বিশদ ব্যবস্থা গ্রহণ করে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যও হিমশিম খাচ্ছে, করোনা ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতার ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না। আমার বিশ্বাস প্রতিষেধক পেতে বেশি দেরি হবে না এবং মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। তবে তা হবে এক ‘নতুন স্বাভাবিক’ সময়।

বাংলাদেশের কথা যদি বলি- একটি বড় ধাক্কা অবশ্যই লেগেছে। সরকারের পাশাপাশি দেশবাসী সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে, যাতে কভিড-১৯ মহামারি থেকে ক্ষয়ক্ষতি যতদূর সম্ভব সীমিত রাখা যায়। অবশ্যই করোনাকাল অতিক্রম করে ‘আবার জমবে মেলা বটতলা হাটখোলা..’। তবে এবারের মেলা হোক গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয়ে। আমরা যদি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, আওয়ামী লীগের ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহার এবং বাস্তবায়নাধীন টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচির মৌল নীতিগুলোর দিকে তাকাই, তাহলে দেখা যাবে মানুষকেন্দ্রিক উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল এবং সরকারের সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকার রয়েছে। এগুলো আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধেরও অঙ্গীকার। করোনাযুদ্ধের সময় সেই অঙ্গীকার শানিত হোক।

 

Source: https://samakal.com/todays-print-edition/tp-editorial-comments/article/200539784/মুক্তিযুদ্ধ-থেকে-করোনাযুদ্ধবাংলাদেশের

About the author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *